20 skills for EHS Professionals

ক্যারিয়ারে সফল হতে একজন Compliance ও EHS কর্মকর্তার যে ২০টি অপরিহার্য দক্ষতা জানা জরুরি

একটি গল্প: হেলমেট মাথায় যে যাত্রা শুরু হয়েছিল

প্রথম দিন

সকাল ৮টা। গাজীপুরের একটা বিশাল গার্মেন্টস কারখানার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ঘামছিল সাদিয়া। হাতে নতুন আইডি কার্ড, মাথায় একটা চকচকে হলুদ হেলমেট, যেটা এখনো ঠিকমতো পরতেই শিখেনি। আজ তার প্রথম দিন—EHS Trainee হিসেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স পড়ার সময় সাদিয়া ভেবেছিল, এই চাকরিটা হয়তো হবে কিছু কাগজপত্র সামলানো, চেকলিস্টে টিক দেওয়া, আর মাঝেমধ্যে হেলমেট-গ্লাভস বিতরণ করা। কিন্তু গেট দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সে দেখল একজন মানুষকে—মাঝবয়সী, চোখে চশমা, হাতে একটা পুরনো ক্লিপবোর্ড, যিনি মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে এক শ্রমিকের সঙ্গে কিছু একটা নিয়ে গভীর মনোযোগে কথা বলছেন।

“তুমিই সাদিয়া, তাই না? আমি ইমরান, EHS Manager।” লোকটা হাত বাড়িয়ে দিলেন। “চলো, আজ থেকে তোমার আসল ক্লাস শুরু। বই থেকে যা শিখেছ, সেটা ভুলে যাওয়ার দরকার নেই, কিন্তু বাস্তবে এই কাজটা অনেক বেশি জীবন্ত।”

সাদিয়া জানত না, আগামী কয়েক মাসে ইমরান ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে করতে সে এমন ২০টা দক্ষতা শিখবে, যা তাকে শুধু একজন ভালো কর্মী নয়, একজন আস্থাভাজন প্রফেশনালে পরিণত করবে।

মই আর একটা প্রশ্ন

প্রথম দিনেই ইমরান ভাই সাদিয়াকে নিয়ে গেলেন ফ্লোরে। এক কোণে একটা মই দাঁড় করানো, যার একটা পায়া সামান্য নড়বড়ে। সাদিয়া চোখ বুলিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু ইমরান ভাই থামিয়ে দিলেন।

“দাঁড়াও। এটা দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার?”

“একটা মই… সামান্য নড়বড়ে,” সাদিয়া বলল।

“শুধু ‘সামান্য নড়বড়ে’ না। এটা একটা সম্ভাব্য দুর্ঘটনার উৎস। কেউ যদি এই মইয়ে উঠে কাজ করে, আর পায়াটা ভেঙে যায়—কী হতে পারে?” ইমরান ভাই প্রশ্ন করলেন। “এটাই হলো Risk Assessment-এর প্রথম পাঠ। কাজ শুরুর আগেই বিপদ চিহ্নিত করা, সেটার সম্ভাবনা আর তীব্রতা বিচার করা, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া।”

তিনি সাদিয়াকে শেখালেন পাঁচটা ধাপ—বিপদ চিহ্নিত করা, কারা ঝুঁকিতে আছে বোঝা, ঝুঁকির মাত্রা মাপা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিক করা, আর সব নথিভুক্ত করে নিয়মিত পর্যালোচনা করা। “যত দিন যাবে, তোমার চোখ এমন ধারালো হয়ে উঠবে যে, অন্যরা যা দেখেই না, তুমি সেটাও ধরে ফেলবে।”

সেদিন বিকেলেই সাদিয়া প্রথমবার নিজের হাতে একটা রিস্ক নোট লিখল। ছোট্ট একটা কাজ, কিন্তু মনে হলো যেন সে প্রথমবার সত্যিকারের কিছু একটা শিখল।

যখন কাগজ কথা বলে

পরের সপ্তাহে ইমরান ভাই একটা মোটা ফাইল সাদিয়ার হাতে দিলেন—HIRA (Hazard Identification and Risk Assessment)। “এটা আমাদের পুরো কারখানার সেফটি সিস্টেমের মেরুদণ্ড,” তিনি বললেন।

সাদিয়া পাতা উল্টে দেখল, প্রতিটা বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা বিপদ চিহ্নিত করা আছে—কেমিক্যাল স্টোরে লিকেজের ঝুঁকি, বয়লার রুমে আগুনের ঝুঁকি, ইলেকট্রিক্যাল প্যানেলে শকের ঝুঁকি। প্রতিটার পাশে একটা রিস্ক ম্যাট্রিক্স—কতটা সম্ভাবনা, কতটা তীব্রতা।

“গত মাসে আমরা একটা নতুন মেশিন বসিয়েছি সুইং সেকশনে। তাই HIRA নতুন করে আপডেট করতে হবে। এটা একবার লিখেই ফেলে রাখা যায় না—নতুন মেশিন এলে, নতুন প্রক্রিয়া চালু হলে, কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, আবার বসতে হয়।”

সাদিয়া প্রথমবার বুঝল, একটা কাগজের ফাইলও কীভাবে জীবন্ত হতে পারে, যদি সেটা নিয়মিত আপডেট করা হয়।

উঁচুতে ওঠার আগে

একদিন এক শ্রমিককে ছাদের কাছাকাছি একটা পাইপ ওয়েল্ডিং করতে হবে। ইমরান ভাই সাদিয়াকে ডাকলেন, “চলো, আজ তোমাকে JSA শেখাই—Job Safety Analysis।”

তারা দুজন গেলেন সেই শ্রমিক, রহিম মিয়ার কাছে। ইমরান ভাই বসলেন তার সঙ্গে, জিজ্ঞেস করলেন প্রতিটা ধাপ—মই বেয়ে ওঠা কীভাবে করবে, হারনেস কোথায় বাঁধবে, স্পার্ক থেকে কীভাবে বাঁচবে।

“স্যার, অফিসে বসে তো আপনারাই লিখে দিতে পারতেন,” সাদিয়া বলল।

রহিম মিয়া হেসে বললেন, “আপা, অফিসে বসে কাগজ লিখলে বাস্তবে যা হয়, তা বোঝা যায় না। আমি জানি কোন জায়গাটায় আমার হাত কাঁপে, কোথায় সবচেয়ে বেশি সাবধান থাকতে হয়।”

ইমরান ভাই সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। “এটাই সবচেয়ে ভালো JSA-এর রহস্য। যারা সরাসরি কাজ করে, তাদের সঙ্গে বসে তৈরি করা—শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও কার্যকর হয়।”

যেদিন প্রশ্ন করতে হয়েছিল

তিন মাস পর একটা দুর্ঘটনা ঘটল। কাটিং সেকশনে একজন শ্রমিকের হাতে সামান্য কেটে গেল। বড় কিছু না, কিন্তু ইমরান ভাই সেটাকেও হালকাভাবে নিলেন না।

“চলো, Incident Investigation করি,” তিনি বললেন।

সাদিয়া ভেবেছিল, ব্যাপারটা সহজ—শুধু জিজ্ঞেস করা “কী হয়েছিল?” কিন্তু ইমরান ভাই দেখালেন, আসল কাজ শুরু হয় তারপর। তারা সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বললেন, ঘটনাস্থল পরীক্ষা করলেন, ছবি তুললেন।

শুরুতে আহত শ্রমিক ভয়ে ভয়ে কথা বলছিলেন, যেন চাকরি হারানোর আতঙ্কে আছেন। ইমরান ভাই নরম গলায় বললেন, “ভাই, আমরা দোষ খুঁজছি না। আমরা জানতে চাই, কীভাবে ভবিষ্যতে এটা আবার না ঘটে।”

সেই আশ্বাসেই শ্রমিক আসল কথাটা বললেন—মেশিনের গার্ড কিছুদিন ধরে ঢিলা ছিল, কিন্তু কেউ রিপোর্ট করেনি। সাদিয়া বুঝল, তদন্তের আসল লক্ষ্য শাস্তি নয়, শেখা।

আগুনের সঙ্গে বন্ধুত্ব নয়

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অগ্নিকাণ্ড একটা অতি স্পর্শকাতর বিষয়—এই কথাটা ইমরান ভাই বারবার বলতেন। একদিন তিনি সাদিয়াকে নিয়ে পুরো কারখানা ঘুরে Fire Safety ইন্সপেকশন করলেন।

“এই এক্সটিংগুইশারটা দেখো,” তিনি একটা লাল সিলিন্ডার দেখিয়ে বললেন। “এক্সপায়ারি ডেট চেক করেছ?”

সাদিয়া ট্যাগ দেখে চমকে উঠল—তিন মাস আগেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। “কিন্তু এটা তো দেখতে একদম ঠিকঠাক!”

“এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক,” ইমরান ভাই বললেন। “দেখতে ঠিক, কিন্তু কাজের সময় হয়তো কাজই করবে না। আর ওই দেখো, ইমার্জেন্সি এক্সিটের দরজায় তালা লাগানো—এটা বড় অপরাধ।”

তারা সেদিনই একটা ইন্সপেকশন চেকলিস্ট তৈরি করলেন, যা প্রতি সপ্তাহে মেনে চলা হবে। সাদিয়া বুঝল, নিরাপত্তা মানে শুধু যন্ত্রপাতি বসানো নয়, নিয়মিত সেগুলো কাজ করছে কি না তা যাচাই করাও।

গন্ধে ভুলো না

কেমিক্যাল স্টোরে ঢোকার সময় সাদিয়ার নাকে একটা তীব্র গন্ধ লাগল। “এটা কী?” সে জিজ্ঞেস করল।

“এটাই তো তোমার আজকের পাঠ—Chemical Management,” ইমরান ভাই বললেন। তিনি একটা বোতল তুলে দেখালেন MSDS শিট—Material Safety Data Sheet। “প্রতিটা কেমিক্যালের নিজস্ব বিপদ আছে। কোনটা কোনটার সঙ্গে মেশানো যাবে না, তা জানতে হয়।”

তিনি সাদিয়াকে দেখালেন লেবেলিং সিস্টেম, স্টোরেজ রুমের বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, আর একটা জরুরি আইওয়াশ স্টেশন। “মনে রেখো, গন্ধ পরিচিত মনে হলেই সেটা নিরাপদ, এমন ভাবা যাবে না। সচেতনতাই এখানে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।”

দুটো সার্টিফিকেট, একটা লক্ষ্য

একদিন অফিসে একটা বড় ফ্রেমে বাঁধানো সার্টিফিকেট দেখে সাদিয়া জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কী, স্যার?”

ISO 14001 আর ISO 45001,” ইমরান ভাই গর্বের সঙ্গে বললেন। “একটা পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য, আরেকটা কর্মস্থলের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার জন্য। এই দুটো সার্টিফিকেট পেতে আমাদের বছরখানেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।”

তিনি ব্যাখ্যা করলেন কীভাবে তারা পানি ব্যবহার ট্র্যাক করেন, কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করেন, আর কর্মীদের মতামত নিয়ে সেফটি পলিসি তৈরি করেন। “এই সার্টিফিকেট থাকলে আন্তর্জাতিক বায়াররা আমাদের বিশ্বাস করে। কিন্তু আসল কথা হলো, এটা শুধু কাগজের সার্টিফিকেট নয়—এটা প্রতিদিনের একটা অভ্যাস।”

অডিটের দিন

মাস ঘুরতে না ঘুরতেই একটা বড় খবর এলো—আন্তর্জাতিক বায়ারের একটা টিম Audit করতে আসছে। পুরো অফিসে একটা চাপা উত্তেজনা।

সাদিয়া দেখল, বেশিরভাগ সহকর্মী শেষ মুহূর্তে কাগজপত্র গোছাতে ব্যস্ত। কিন্তু ইমরান ভাইয়ের ফাইল ক্যাবিনেট আগে থেকেই সাজানো।

“কীভাবে আপনি এত রিল্যাক্স, স্যার?” সাদিয়া জিজ্ঞেস করল।

“কারণ আমি সারা বছর ধরে নথিপত্র আপডেট রাখি। অডিটের দিনের জন্য অপেক্ষা করি না।” অডিটের দিন যখন অডিটর কঠিন প্রশ্ন করলেন, ইমরান ভাই সৎ এবং সরাসরি উত্তর দিলেন, এমনকি একটা ছোট দুর্বলতাও লুকালেন না। “তথ্য লুকানোর চেষ্টা করলে বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হয়ে যায়,” পরে তিনি সাদিয়াকে বললেন।

সেই অডিটে তারা ভালো ফল পেল। সাদিয়া বুঝল, Audit Management মানে ভয় পাওয়া নয়, প্রস্তুত থাকা।

“কেন” প্রশ্নটা থামে না

একটা মেশিন বারবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল কাটিং সেকশনে। মেকানিক বারবার এসে ঠিক করে যাচ্ছেন, কিন্তু কয়েকদিন পরই আবার সমস্যা।

“চলো Root Cause Analysis করি,” ইমরান ভাই বললেন। তিনি সাদিয়াকে শেখালেন “5 Why” পদ্ধতি।

“মেশিনটা বন্ধ হয়ে যায় কেন?” “কারণ মোটর গরম হয়ে যায়।” “মোটর গরম হয় কেন?” “কারণ ঠিকমতো লুব্রিকেশন হয় না।” “লুব্রিকেশন হয় না কেন?” “কারণ শিডিউল মেনটেন্যান্স মিস হয়ে যাচ্ছে।” “কেন মিস হয়?” “কারণ কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নেই।”

শেষ প্রশ্নে এসে আসল সমস্যাটা বেরিয়ে এলো—এটা মোটরের সমস্যা নয়, ব্যবস্থাপনার সমস্যা। সাদিয়ার চোখ চকচক করে উঠল। “তাহলে আমরা শুধু মেরামত না করে, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেব!”

“ঠিক ধরেছ,” ইমরান ভাই হাসলেন।

অস্পষ্টতা নয়, নির্দিষ্টতা

সেই মেশিনের সমস্যা সমাধানের জন্য তারা একটা CAPA (Corrective and Preventive Action) পরিকল্পনা লিখলেন। প্রথমে সাদিয়া লিখেছিল, “ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকতে হবে।”

ইমরান ভাই কেটে দিলেন। “এটা কোনো পরিকল্পনা না, সাদিয়া। লেখো—কে, কবে, কী করবে।”

সাদিয়া নতুন করে লিখল: “১৫ তারিখের মধ্যে করিম ভাই প্রতি সপ্তাহে মেশিনের লুব্রিকেশন চেক করবেন এবং লগবুকে সই করবেন।”

“এখন এটা একটা আসল পরিকল্পনা,” ইমরান ভাই বললেন। “নির্দিষ্ট সময়সীমা আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া কোনো CAPA কাজ করে না।”

শুধু মুনাফা নয়

একদিন একটা ইমেইল এলো—একটা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অর্ডার দেওয়ার আগে কারখানার ESG (Environmental, Social & Governance) পারফরম্যান্স যাচাই করতে চায়।

“এটা কী, স্যার?” সাদিয়া জিজ্ঞেস করল।

“এটা বোঝায়, আমরা শুধু পণ্য বানাই না, পরিবেশ আর মানুষের প্রতিও দায়বদ্ধ কি না।” ইমরান ভাই ব্যাখ্যা করলেন কীভাবে তারা কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাচ্ছেন, কর্মীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করছেন। “আজকাল বায়াররা শুধু দাম দেখে না, ESG রিপোর্টও দেখে। যে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে থাকে, তারাই টিকে থাকে।”

ভাষা বদলে যায়, বার্তা নয়

একদিন সাদিয়াকে একটা সেফটি বার্তা দুইভাবে উপস্থাপন করতে হলো—একবার ফ্লোরের শ্রমিকদের সামনে, আরেকবার ম্যানেজমেন্টের মিটিংয়ে।

শ্রমিকদের সামনে সে গল্পের মতো বলল, রহিম মিয়ার মতো কারও উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু ম্যানেজমেন্টের সামনে সে পরিসংখ্যান আর গ্রাফ দিয়ে যুক্তি সাজাল।

মিটিং শেষে ইমরান ভাই বললেন, “তুমি আজ Communication-এর আসল রহস্যটা ধরে ফেলেছ। একই বার্তা, কিন্তু ভিন্ন ভাষায়। শ্রমিক আর ম্যানেজমেন্ট—দুজনের কাছে পৌঁছাতে হলে দুটো আলাদা কণ্ঠস্বর দরকার।”

যখন না বলতে হয়

একবার প্রোডাকশন টার্গেট পূরণের প্রচণ্ড চাপ ছিল। একটা মেশিন সন্দেহজনক শব্দ করছিল, কিন্তু ফ্লোর ম্যানেজার বললেন, “চালিয়ে যাও, ডেলিভারি ডেট কালকে।”

ইমরান ভাই সরাসরি মেশিন বন্ধ করে দিলেন। “না, এটা বন্ধ করতে হবে। আগে চেক করা হবে, তারপর চালু হবে।”

ফ্লোর ম্যানেজার রেগে গেলেন, কিন্তু ইমরান ভাই অনড় রইলেন। পরে সাদিয়াকে বললেন, “এটাই Leadership। জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কারও জীবনের চেয়ে বড় কোনো ডেডলাইন নেই।”

সাদিয়া সেদিন বুঝল, নেতৃত্ব মানে বড় পদ নয়, সঠিক মুহূর্তে সাহস দেখানো।

যে রিপোর্ট পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়

সাদিয়ার প্রথম মাসিক রিপোর্ট লেখার পালা এলো। সে লম্বা লম্বা বাক্যে, জটিল ভাষায় লিখল। ইমরান ভাই পড়ে হাসলেন।

“সাদিয়া, এই রিপোর্ট পড়ে ম্যানেজমেন্ট কী সিদ্ধান্ত নেবে?”

সাদিয়া থমকে গেল। সত্যিই তো, রিপোর্টে তথ্য ছিল, কিন্তু স্পষ্ট বার্তা ছিল না।

“সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্যবহুল লেখো। একটা গ্রাফ যোগ করো, যাতে একনজরেই বোঝা যায় গত মাসে দুর্ঘটনা বেড়েছে না কমেছে।” সাদিয়া নতুন করে লিখল, এবার সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট, আর একটা সাধারণ বার চার্ট দিয়ে। এবার ম্যানেজমেন্ট মিটিংয়ে সেই রিপোর্ট নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত হলো। Report Writing-এর আসল শক্তি সাদিয়া প্রথমবার টের পেল।

আইন কখনো ঘুমায় না

একদিন সরকারি গেজেটে একটা নতুন নিয়ম প্রকাশ হলো, যা তাদের কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে। ইমরান ভাই তৎক্ষণাৎ সেটা নোট করলেন তাদের Legal Compliance রেজিস্টারে।

“আইন প্রতিনিয়ত বদলায়, সাদিয়া। যে ঘুমিয়ে থাকে, সে একদিন জরিমানার মুখে পড়ে।” তিনি দেখালেন কীভাবে একটা চেকলিস্ট রাখলে কোন আইন কবে আপডেট করতে হবে, তা সহজে ট্র্যাক করা যায়।

সাদিয়া বুঝল, আইন জানাই যথেষ্ট নয়—সেটা প্রতিদিনের কাজে প্রয়োগ করাটাই আসল দক্ষতা।

যখন শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে কারখানার মেঝে

একদিন সাদিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হলো নতুন শ্রমিকদের Training দেওয়ার। প্রথমবার সে পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড নিয়ে গেল, ভারী ভারী শব্দ ব্যবহার করে বক্তৃতা দিল। শ্রমিকদের চোখে ঘুম ঘুম ভাব।

ইমরান ভাই পরে বললেন, “তারা তোমার কথা বুঝতেই পারেনি। পরের বার গল্প বলো, বাস্তব উদাহরণ দাও।”

দ্বিতীয়বার সাদিয়া রহিম মিয়ার হাত কাটার ঘটনাটা বলল, দেখাল কীভাবে সহজ একটা সতর্কতায় সেটা এড়ানো যেত। এবার শ্রমিকরা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, প্রশ্ন করলেন। সেশন শেষে একজন এসে বললেন, “আপা, আজ প্রথম বুঝলাম কেন গার্ড খোলা রাখা বিপজ্জনক।”

সাদিয়ার বুকটা গর্বে ভরে উঠল।

যখন ঘণ্টা বাজে

একদিন হঠাৎ ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠল—এবার সত্যিকারের মক ড্রিল। ইমরান ভাই আগে থেকে জানাননি। সবাই ছোটাছুটি শুরু করল।

সাদিয়া দেখল, ইমরান ভাই মাথা ঠান্ডা রেখে হাতে স্টপওয়াচ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক করছেন কোথায় ইভাকুয়েশনে দেরি হচ্ছে, কোথায় বাধা তৈরি হচ্ছে।

ড্রিল শেষে তিনি বললেন, “এটাই Emergency Response। বাস্তব পরিস্থিতির মতো অনুশীলন করলেই আসল প্রস্তুতি বোঝা যায়। শুধু আনুষ্ঠানিকতা করলে বাস্তবে কাজে আসে না।” তারা দেখলেন, তিন নম্বর সিঁড়িতে একটা বাধা তৈরি হচ্ছিল—পরের সপ্তাহেই সেটা ঠিক করা হলো।

সংখ্যার ভেতরের গল্প

মাস শেষে সাদিয়া একটা এক্সেল শিট খুলে বসল, গত ছয় মাসের সব দুর্ঘটনার তথ্য নিয়ে। Data Analysis করতে করতে সে একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেল—একটা নির্দিষ্ট বিভাগে বারবার হাত কাটার ঘটনা ঘটছে।

সে ইমরান ভাইকে দেখাল গ্রাফটা। “স্যার, দেখুন, এই বিভাগেই সবচেয়ে বেশি!”

ইমরান ভাই খুশি হলেন। “এটাই তথ্যের শক্তি। দুর্ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় না থেকে, আগে থেকেই বুঝে ফেলা—কোথায় ঝুঁকি বাড়ছে।” তারা সেই বিভাগে গিয়ে দেখলেন, PPE ঠিকমতো ব্যবহার হচ্ছে না। সমস্যাটা দুর্ঘটনায় পরিণত হওয়ার আগেই ধরা পড়ল।

যাত্রা কখনো শেষ হয় না

এক বছর পূর্ণ হলো সাদিয়ার। একদিন সে ইমরান ভাইকে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, এতদিনে তো আপনার সব সিস্টেম প্রায় নিখুঁত। এখন আর কী করার বাকি?”

ইমরান ভাই হাসলেন। “সাদিয়া, EHS-এ কখনো ‘সম্পূর্ণ’ বলে কিছু নেই। আজ যা যথেষ্ট মনে হচ্ছে, কাল হয়তো তা যথেষ্ট নয়। নতুন প্রযুক্তি আসবে, নতুন আইন আসবে, নতুন ঝুঁকি আসবে।”

তিনি দেখালেন তাদের PDCA (Plan-Do-Check-Act) সাইকেল—প্রতি মাসে অন্তত একটা প্রক্রিয়া একটু হলেও উন্নত করার চেষ্টা। “এটাই Continuous Improvement। ছোট ছোট উন্নতিই দীর্ঘমেয়াদে বিশাল পরিবর্তন আনে।”

সাদিয়া বুঝল, এই মানসিকতাই বাকি ১৯টা দক্ষতাকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।

এক বছর পর

আজ সাদিয়া আর সেই ভয়ে ভয়ে হাঁটা মেয়েটা নেই। এখন সে নিজেই নতুন ট্রেইনিদের শেখায়, মই দেখে থমকে দাঁড়ায়, MSDS শিট পড়তে জানে, রিপোর্ট লেখে যা পড়ে মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

একদিন করিডোরে দেখা হলো ইমরান ভাইয়ের সঙ্গে। “স্যার, আমি কি এখন প্রস্তুত?” সাদিয়া জিজ্ঞেস করল।

ইমরান ভাই মৃদু হাসলেন। “কেউই কখনো সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয় না, সাদিয়া। কিন্তু তুমি এখন জানো কীভাবে শিখতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে মানুষকে রক্ষা করতে হয়। এটাই আসল যোগ্যতা।”

আপনার জন্য

আপনি যদি সাদিয়ার মতো এই পথে হাঁটতে চান, তাহলে জেনে রাখুন—এই যাত্রায় দরকার হবে ২০টা দক্ষতা: Risk Assessment, HIRA, JSA, Incident Investigation, Fire Safety, Chemical Management, ISO 14001, ISO 45001, Audit Management, Root Cause Analysis, CAPA, ESG, Communication, Leadership, Report Writing, Legal Compliance, Training Skill, Emergency Response, Data Analysis, আর সবার উপরে—Continuous Improvement।

এই দক্ষতাগুলো একদিনে আসে না। NEBOSH বা IOSH-এর মতো কোর্স ভিত্তি তৈরি করে দেয়, কিন্তু আসল শিক্ষা আসে ফ্লোরে দাঁড়িয়ে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, ভুল করে এবং সেই ভুল থেকে শিখে।

প্রতিটা সকালে যখন একজন শ্রমিক পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কারখানায় আসেন, তার একটাই প্রত্যাশা থাকে—দিনশেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়া। সেই প্রত্যাশা পূরণের পেছনে থাকে সাদিয়া আর ইমরান ভাইয়ের মতো মানুষদের নীরব পরিশ্রম, যা প্রায়ই কারও চোখে পড়ে না।

তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন—আপনার নিজের যাত্রা কোথা থেকে শুরু হবে? কারণ শেষ পর্যন্ত, নিরাপত্তা কোনো একদিনের কাজ নয়, এটা একটা জীবনব্যাপী চর্চা—ঠিক যেমনটা সাদিয়া শিখেছিল, একটা নড়বড়ে মইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *