শুধু-হেলমেট-না-হেল্পলাইনও-দিন

শুধু হেলমেট না, হেল্পলাইনও দিন: OHS-এর সাথে মানসিক সহায়তা যুক্ত করার সময় এসেছে

রহিমার সকাল

ভোর ছয়টা। রহিমা বেগম তখনও বিছানায়, কিন্তু ঘুম নেই চোখে। সারারাত এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছেন। মাথার ভেতর একটা পাথর যেন বসে আছে—লাইন টার্গেট পূরণ হবে কিনা, সুপারভাইজারের ধমক, বাড়িওয়ালার ভাড়ার তাগাদা, আর ছেলেটার স্কুলের বেতন। সাত বছর ধরে গাজীপুরের একটা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে যখন তিনি কারখানার গেটে পৌঁছান, নিরাপত্তারক্ষী তাঁর ব্যাগ চেক করে, হেলমেট-পরা সুপারভাইজার তাঁকে লাইনে বসিয়ে দেন, ফায়ার এক্সিট দেখিয়ে দেওয়া হয়, ফার্স্ট এইড বক্সের অবস্থান মুখস্থ করানো হয়েছে বহুবার মক ড্রিলে।

কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ একবারও জিজ্ঞেস করেনি, রহিমা ভালো আছেন কিনা। তাঁর মন কেমন আছে, রাতে ঘুম হয় কিনা, বুকের ভেতর চাপা একটা কষ্ট নিয়ে তিনি প্রতিদিন মেশিনের সামনে বসেন কিনা—এসব প্রশ্নের জায়গা কারখানার কোনো নিয়মে নেই।

একটা সাধারণ দিন, একটা অসাধারণ ভাঙন

দুপুরের দিকে রহিমার হাত থেকে কাপড়ের বান্ডিল পড়ে যায়। চোখে পানি, হাত কাঁপছে। সহকর্মীরা ছুটে আসেন, কেউ পানি দেয়, কেউ বলে “শরীর খারাপ?” রহিমা মাথা নাড়েন, কিন্তু আসল কথাটা বলতে পারেন না—যে তাঁর মনে হচ্ছে তিনি আর পারছেন না, প্রতিদিনকার এই চাপ যেন তাঁকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে।

কারখানার মেডিকেল রুমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন নার্স তাঁর রক্তচাপ মাপেন, প্যারাসিটামল দেন, বলেন “একটু রেস্ট নিয়ে আবার কাজে যাও।” কেউ জিজ্ঞেস করেন না—রহিমার মনের ভেতর কী চলছে। কারণ এই মেডিকেল রুমে শারীরিক চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু মনের চিকিৎসার কোনো জায়গা নেই।

রহিমা সেদিন বাড়ি ফেরেন, কিন্তু তাঁর মতো হাজারো শ্রমিকের গল্প প্রতিদিন এভাবেই নীরবে হারিয়ে যায়—কোনো রেকর্ডে লেখা থাকে না, কোনো রিপোর্টে ওঠে না। কারণ এটা কোনো “দুর্ঘটনা” নয়, এটা একটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া মানুষ।

আমিনুল ভাইয়ের গল্প

একই কারখানায় কাজ করেন আমিনুল, প্রোডাকশন লাইনের একজন অপারেটর। তাঁর গল্পটা একটু আলাদা। ছয় মাস আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন, ঋণের বোঝা মাথায়, স্ত্রীর সাথে সম্পর্কেও টানাপোড়েন। কাজে মন বসে না, প্রায়ই ভুল হয় মেশিন চালাতে গিয়ে। একদিন প্রায় হাত কেটে ফেলার উপক্রম হয়—সময়মতো সহকর্মী টেনে না ধরলে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত।

ঘটনার পর তদন্ত হয়, মেশিনের সেফটি গার্ড ঠিকঠাক ছিল কিনা দেখা হয়, আমিনুলকে আবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় মেশিন পরিচালনার নিয়ম নিয়ে। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করেনি—আমিনুল কেন সেদিন মনোযোগ হারিয়েছিলেন। তাঁর মাথায় তখন কী চলছিল। কারণ OHS-এর খাতায় “মানসিক অমনোযোগ” বলে কোনো কলাম নেই, আছে শুধু “যান্ত্রিক ত্রুটি” আর “মানবিক ভুল”।

অথচ আমিনুলের সেই দুর্ঘটনার পেছনের আসল কারণ ছিল তাঁর ভেতরের অদৃশ্য যন্ত্রণা, যা কোনো হেলমেট, কোনো গ্লাভস ঠেকাতে পারেনি।

একটা ভিন্ন কারখানার গল্প

কিন্তু কল্পনা করুন আরেকটা কারখানার কথা। সেখানেও রহিমা আছেন, আমিনুল আছেন—কিন্তু একটা জিনিস আলাদা। গেটের পাশে নিরাপত্তা নির্দেশিকার বোর্ডের ঠিক নিচে আরেকটা ছোট পোস্টার সাঁটা—একটা হেল্পলাইন নম্বর, লেখা “মন খারাপ লাগলে, কথা বলতে চাইলে, এই নম্বরে কল করুন। সম্পূর্ণ গোপনীয়, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।”

সেই কারখানায় রহিমা যেদিন ভেঙে পড়েছিলেন, মেডিকেল রুমের নার্স তাঁকে শুধু প্যারাসিটামল দেননি, বলেছিলেন, “চলো, একজনের সাথে কথা বলি।” ফোন করা হয় হেল্পলাইনে, একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর রহিমার সাথে কথা বলেন আধঘণ্টা ধরে। কেউ তাঁর চাকরি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, কেউ তাঁকে “দুর্বল” বলেনি। বরং সপ্তাহে একবার করে কয়েক মাস কাউন্সেলিং চলে, আর ধীরে ধীরে রহিমা নিজেকে আবার গুছিয়ে নিতে শেখেন।

আমিনুলের ক্ষেত্রেও সুপারভাইজার ট্রেনিং পেয়েছিলেন কীভাবে কর্মীর মধ্যে মানসিক চাপের লক্ষণ চিনতে হয়। বাবার মৃত্যুর পর আমিনুলের আচরণে পরিবর্তন তাঁর চোখ এড়ায়নি। তাঁকে জোর না করে, সম্মানের সাথে হেল্পলাইনের কথা বলা হয়। আমিনুল প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন, কিন্তু পরে কথা বলে কিছুটা হালকা বোধ করেন। দুর্ঘটনাটা হয়তো আগেই ঠেকানো যেত।

দুটো বাস্তবতা, একটাই পার্থক্য

এই দুটো কারখানার গল্পে শ্রমিক একই, চাপ একই, জীবনের যন্ত্রণাও একই। পার্থক্য কেবল একটা জায়গায়—একটা কারখানা মানসিক স্বাস্থ্যকে নিরাপত্তা নীতিমালার বাইরে রেখেছে, আরেকটা তাকে ভেতরে এনেছে। একটা কারখানায় শ্রমিকের কষ্ট নীরবে জমা হতে হতে একদিন দুর্ঘটনা বা ভাঙনে রূপ নেয়, আরেকটায় সেই কষ্টের একটা বাইরে যাওয়ার পথ থাকে।

বাস্তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মক্ষেত্র এখনো প্রথম গল্পের মতো—হেলমেট আছে, ফায়ার এক্সিট আছে, সেফটি অফিসার আছে, কিন্তু মনের জন্য কোনো দরজা খোলা নেই। অথচ রহিমা আর আমিনুলের মতো লক্ষ লক্ষ শ্রমিক প্রতিদিন এই নীরব সংগ্রাম নিয়ে কাজে আসেন।

একটা নম্বর, একটা জীবন

একটা হেল্পলাইন নম্বর দেখতে খুবই সাধারণ—কয়েকটা সংখ্যা, একটা পোস্টার। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা। যে মুহূর্তে একজন কর্মী বুঝতে পারেন তাঁর কষ্টের কথা বলার একটা জায়গা আছে, যেখানে তাঁকে বিচার করা হবে না, চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হবে না—সেই মুহূর্তেই একটা পরিবর্তনের সূচনা হয়।

প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা কোনো বিশাল বিনিয়োগের ব্যাপার নয়। একটা হেল্পলাইন সেবা চুক্তি, কিছু পোস্টার, ব্যবস্থাপকদের জন্য সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একটা সংস্কৃতি যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাটা লজ্জার নয়, বরং স্বাভাবিক একটা বিষয়। এই ছোট পদক্ষেপগুলোই রহিমার মতো হাজারো শ্রমিকের জীবনে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

শেষ কথা

হেলমেট মাথা বাঁচায়, কিন্তু রহিমার রাতের নির্ঘুম দুশ্চিন্তা, আমিনুলের ভেতরের ভাঙন—এসবের জন্য দরকার আরেকটা সুরক্ষা, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু সমান জরুরি। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা শরীরের পাশাপাশি মনকেও আগলে রাখে।

বাংলাদেশের প্রতিটা কারখানা, প্রতিটা কর্মক্ষেত্র যদি তাদের নিরাপত্তা নীতিমালায় একটা ছোট্ট হেল্পলাইন নম্বর যুক্ত করে, তাহলে হয়তো আর কোনো রহিমাকে নীরবে ভেঙে পড়তে হবে না, আর কোনো আমিনুলকে একা একা যুদ্ধ করতে হবে না নিজের মনের সাথে। শুধু হেলমেট নয়, একটা হেল্পলাইনও হতে পারে একজন শ্রমিকের জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *